মাল্টান ডায়েরি (Trip To Malta) পর্ব ০১

অনেকদিন পর লিখতে বসলাম, ইদানীং লিখালিখি করতে বড্ড আলসেমি লাগে! মাঝে মাঝে ই এদিক ওদিক ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করে। প্ল্যান করতে বসলেই গরীবের সম্বল ফ্লিক্স বাস বা রায়ান এয়ারে চোখ বুলাই। মার্চের শুরুর দিকে হটাত করেই মাল্টা নামক এক দ্বিপ দেশের সন্ধান পাই যেখানে রায়ান এয়ারে অনেক চিপে ভ্রমণ করা যাবে। এই দেশ নিয়ে কোন ধরনের কোন আইডিয়া ছিল নাহ প্লাস তার আগে এই নামে যে ফল ছাড়াও কিছু থাকতে পারে কল্পনা করি নাই।
যেহেতু ঘুরতে যেতে চাচ্ছি এন্ড ভাল অফার, নগদে টিকেট কেটে ফেললাম। তারপর কাছের আর কিছু মানুষ কে জানালাম ওরা যেতে চায় কিনা সাথে, অপরিচিত স্পট বলে অনেকে না করে দিলো আর কেউ কেউ লেট করায় টিকেট প্রাইজ হাই হয়ে যাওয়ায় মেডাম কে নিয়ে আমি একা ই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।



প্রথমের গুগল করে মাল্টা সম্বন্ধে কিছু বেসিক ইনফো কালেক্ট করলাম। হিসেব করে দেখলাম সম্পূর্ণ দেশ আয়তনে আমাদের রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ২০ কিলোর মত বড়। ৩ টা ছোট দ্বিপ নিয়ে এই দেশ। সবচে বড়ও দ্বিপের মানে মাল্টার নাম অনুযায়ী এই দেশের নাম, পাশের ২ টা দ্বিপ হচ্ছে গোযো এবং কমিনো।


মজার ব্যপার হচ্ছে এই দেশের চারপাশে ই সমুদ্র হওয়ায় এখানে যাওয়ার অপ্সান হচ্ছে অনলি আকাশ পথ। সমুদ্র পথে শুধুমাত্র পণ্য পরিবহন করা হয়, তবে মাঝে মাঝে বিশাল আকারের শিপ নিয়েও কেউ কেউ বেড়াতে আসে।
প্ল্যানের টিকেট কাটার পর প্রথম কাজ হচ্ছে হোটেল বুকিং দেয়া। যেহেতু মার্চে তেমন করে সামার আসে নাহ, তাই ইউরোপে এটা হচ্ছে অফপিক টাইম, তবে এই টাইমে ভ্রমণ করার অনেক সুবিধা। বড় সুবিধা হচ্ছে হোটেল অনেক চিপে পাওয়া যায়। আমরা যেই ২ টা হোটেলে ৪ রাত ছিলাম, ওগুলো নাকি ৫ স্টার হোটেল ( হোটেল প্যারাডাইজ এন্ড গোল্ডেন বে)  এন্ড পিক সিজনে আমাদের বুকিং করা দামের ৫ গুন নাকি দিতে হয়, তবে আমরা অনেক চিপে পেয়েছিলাম।
তবে মাল্টার ক্ষেত্রে একটা ভাল দিক হচ্ছে এই দেশের সব দিকেই সমুদ্র হওয়ায় যেকোনো বিচের পাশেই সি- ভিউ রুম পাওয়া যায়, বাড়তি প্যারা নিতে হয় নাহ রুমে বসে সমুদ্র দেখার জন্য।

নির্ধারিত দিনে রায়ান এয়ারের ফ্লাইটে চড়ে আমরা মাল্টা পৌঁছে যাই। নাম্বার সময় টা ছিল অসাধারণ, উপর থেকে বার্ডস আই ভিউ তে মাল্টা কে দেখা যাচ্ছিল নীলের মাঝে মণির মত। তবে এয়ারপোর্ট দেখে যথেষ্ট হতাশ হয়েছিলাম, অনেক ছোট এন্ড সিম্পল। অন্তত আমি যেই শহরে থাকি ওটার এয়ারপোর্ট ও এটার থেকে বড় এন্ড বেটার। তবে ইউরোপ থেকে ঘুরতে আসায় ভি আই পি ট্রিটমেন্ট পেলাম, আলাদা গেট দিয়ে রাজার হালে বের হয়ে আসলাম চেকিং পার হয়ে। অন্য যারা ইউরোপের বাহির থেকে গিয়েছিলো ওদের মেলা হ্যাপা এন্ড চেকিং চলছিলো।

এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার আগেই মাল্টায় ঘুরার আনলিমিটেড বাসের কার্ড কিনে নেই ২১ ইউরো করে ৭ দিনের জন্য, যদি আমরা ৭ দিন ছিলাম নাহ। যেহেতু অনেকগুলো প্লেস ঘুরার টার্গেট ছিল, তাই আনলিমিটেড নিয়েছিলাম, কার ইচ্ছা হচ্ছে ১২ বার পাঞ্চ ১৫ ইউরো তে ওই টিকেট ও নিতে পারে। প্রতিবার পাঞ্চ করার পর ১.৫ ঘণ্টা ট্রাভেল করা যায়, তারপর আবার পাঞ্চ করতে হয়।
এয়ারপোর্টের বাহিরে থেকে ই বাস ধরা যায়। তবে আমাদের হোটেল যেহেতু একটু দূরে এন্ড আমরা ডাবল জার্নি করতে চাচ্ছিলাম নাহ অনলি ফর লাগেজ, তাই আমরা এয়ারপোর্টে লেগেজ ড্রপ সার্ভিস ইউজ করেছিলাম। ৬ ঘণ্টার জন্য মে বি ১০ ইউরো এর মত ছিল। আমরা একটু লম্বা সময়ের জন্য লাগেজ ড্রপ করে অনলি ক্যামেরা নিয়ে হাত ফ্রি করে মাল্টার রাজধানী ভেলেট্টার উদ্দেশ্যে রওনা হই। মাল্টার পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম খুব ই ভালো অন্তত মেইন সেন্টারের সাথে। সব কয়টা বাস ই ভেলেট্টা হয়ে যায়। ভেলেট্টা বাস স্টপের পাশে ই শুরু হয় আমাদের প্রথম দিনের ঘুরাঘুরি।
এই ফোয়ারার পাশেই বাস থামবে। এখানে নেমে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করলাম, সাথে কিছু ছবি তুলার পর্ব, যেহেতু আমি আগে ই ইউটিউব ঘেঁটে আমার পরিকল্পনা ঠিক করে রেখেছিলাম, তাই সব কিছু প্ল্যান মোতাবেক ই ছিল। তবে কার আইডিয়া না থাকলে এখানে একটা ইনফো সেন্টার আছে, যেখান থেকে সব ধরনের ইনফো এক্সেস করা সম্ভব। 

এখান থেকে ই শুরু হয় আমাদের জার্নি। প্রথমেই আমরা এখানকার একটা আউটলাইন দেখে নেই, যাতে আইডিয়া করা যায় কোন দিক ধরে হাঁটা শুরু করতে হবে। 
এখানে মূলত ভেলেট্টার মেইন আকর্ষণ গুলোর আইডিয়া দেয়া আছে, যেমন বাকিংহাম প্যালেস, সেন্ট জোন্স চার্চ, বিগ বেল, ওয়ার মিউজিয়াম, আপার বারাক্কা গার্ডেন। 
প্রথমে আমরা রিপাবলিক স্ট্রিট ধরে হাঁটা শুরু করি, হাঁটার পথে পরে 
 ছবিঃ বারাক্কা গার্ডেনের নিচের পার্ট। 
ছবিঃ রিপাবলিক স্ট্রিট, রাস্তার শেষ মাথায় দেখা যাচ্ছে সমুদ্র 
ছবিঃ কিছু একটা ছিল, নাম ভুলে গেছি। তবে সিঁড়ি তে বসে থাকা ভদ্রলোক কিন্তু বাংলাদেশি, মিনিমাম ৩-৪ ঘণ্টা বাসায় কথা বলছিল, আমরা ব্যাক করার সময় ও দেখছিলাম উনি কথা বলছেন এন্ড যথেষ্ট জোরে। 

এই রাস্তা ধরে সামনে হাঁটলে হ্যাটের বাম পাশে পরবে সেন্ট জনেসের গির্জা এন্ড এটা নামি ভিতরে স্বর্ণে মোড়ানো, একে চার্চের প্রতি আগ্রহ কম, তার উপর বিশাল লাইন সময় ন্যস্ত করবে বলে এটা স্কিপ করেছিলাম। 
ছবিঃ সেন্ট জোন্স গির্জার বাহিরের দিক 

ছবিঃ অফপিক সিজনে এই অবস্থা হলে পিক সিজনে কি হয় কল্পনা করতে ভয় পাচ্ছি! 

ছবিঃ গির্জার পাশে ই সুন্দর একটা মনুমেন্ট আছে। সবাই দেখি ফুল দেয়া শুরু করেছে, কেন, জানি নাহ।
 একটু সামনে গেলে ই দেখা পাওয়া যাবে মাল্টার সেন্ট্রাল লাইবেরির, এন্ট্রি ফ্রি, তবে বেশি আতেল নাহ বলে ভিটরে যাওয়ার সহস করি নাই। 
ছবিঃ সেন্ট্রাল লাইব্রেরি মাল্টা 
রাস্তা ধরে সামনে হাঁটলে হাতের ডানে পরবে বাকিংহাম প্যালেস, এটা দেখলে বুঝা যাবে ব্রিটিশ রা কি পরিমাণ বিটিস ছিল, ক্ষুদ্র এই দ্বিপ কেও রক্ষা দেয় নাই গ্রিপ থেকে। 
ছবিঃ বাকিংহাম প্যালেসের ভিতরের অংশ। 

ছবিঃ বাকিংহাম প্যালেসের বাহিরের অংশ, এত ভিড় ছিল জে পিক তুলতে অনেক কসরত করতে হয়েছিল। 
 ছবিঃ বাকিংহাম প্যালেসের দারোয়ান :p

 ছবিঃ রিপাবলিক স্ট্রিটের শেষ প্রান্ত, যেই রাস্তা গিয়ে সাগরে মিলিয়েছে।


ছবিঃ ইউরোপের জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে আছে ২য় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর সব স্মৃতি, ওগুলো আগেও দেখা হয়েছে, তাই এটা স্কিপ করেছিলাম, প্লাস টিকেট ছিল ২৫ ইউরোর মত, তাই আগ্রহ পাই নাই। 
তারপর আমরা সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে হেঁটেছিলাম আর মাল্টার প্রেমে পরে গিয়েছিলাম তার রূপ আর মোহ দেখে। তাপমাত্রা ছিল ১৮-১৯ এর মত প্লাস রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া। তার কিছু পিক নিচে, আমার ছবি তোলার হাত ভালো নাহ, নাহলে আরও ভালো কিছু তুলে আনা যেতো। 




 আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম বিগ বেলের দিকে, ওটা মেইনলি অনেক উঁচু একটা জায়গায় বিশাল একটা ঘণ্টা এন্ড ওটা প্রতিদিন ১২ টার দিকে বাজে, তখন আসে পাশে থাকলে কানে তালা লেগে যাবে।

বিশাল ঘড়ির পাশেই শুয়ে থাকতে দেখা যাবে সূর্য দেবতা কে, জার গায়ে দিনের প্রথম কিরণ পরে বলে মতবাদ প্রচলিত আছে। 
  
হাটতে হাটতে খুদা লেগে যাওয়ায় পাশের এক দোকানে লাঞ্চ করতে গিয়ে দেখি এক আশ্চর্য টিয়া পাখি, যার গাইয়ের রং ধূসর এন্ড এটা খালি একটু পর পর সিটি বাজাচ্ছিল! 
নিচের দিক মোটামুটি দেখা শেষ বলে আমরা উপরের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই, তবে এত রাস্তা আবার ঘুরে ফেরত যেতে ইচ্ছা করছিল নাহ, তাই আমরা ইউরোপের সবচে বড় পাহাড়ি লিফটের আশ্রয় নেই। জনপ্রতি মাত্র ১ ইউরো তে ২২ তলা সমান পাহাড়ে উঠে যাই চোখের পলকে। উল্লেখ্য যে, নাম্বার সময় লিফটে কোন টাকা পে করতে হয় নাহ। 

উপরে উঠে কি দেখেছিলাম আর কোথায় কোথায় গিয়েছিলাম জানতে পাশে থাকুন............।। চলবে ......... 

মন্তব্যসমূহ