জীবনের অপূর্ণতা নাকি বাস্তবতা? জানি নাহ, জানতে চাই ও নাহ !




বাস্তব জীবনে আমি অনেক কাটখোট্টা, অনেক বেশি আবেগহীন। তবে মুভি দেখতে বসলে ই ভিতরের আমি বের হয়ে আসে মাঝে মাঝে। নিজে ই হতবাক হয়ে যাই আমি এতো আবেগি দেখে।
কোন কাজ ছিল নাহ, হটাত করে ই ইচ্ছা করলো "তারে জমিন পার" মুভি টা দেখার জন্য।  দেখতে দেখতে ই নিজের লেংটা কাল মনে পরে গেলো। ছবি আঁকার অনেক ইচ্ছা ছিল। হাতি ঘোড়া, ছাতা মাথা আঁকতাম। তবে যাই আঁকতাম দেখে অনেক ভালো লাগতো, ইচ্ছা করত আরও কিছু আঁকি। কিন্তু রং পেন্সিল কিনা তখন অনেক বিলাসিতা মনে হতো। বাবা কে বলতাম নাহ, একদিন সাহস করে বলে ই ফেলেছিলাম। আব্বু এমন এক ধমক দিলো, মনে হল যে আমি উনার ল্যান্ড প্রপার্টি আমার নামে চেয়ে ফেলেছি।

তবে সন্ধ্যার পর আব্বু যখন এক প্যাকেট কালার পেন্সিল এনে দিলো, তখন মনে হয়েছিল আমার বাপ দুনিয়ার সবচে ভালো বাপ।
ওইদিন রাতে ঘুমাতে পারি নাই উত্তেজনায়। বালিশের নিচে রং পেন্সিলের প্যাকেট নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম।
পরের দিন বৃহস্পতিবার ছিল। সারাদিন কিছু করার টাইম পাই নাই, তবে পরেরদিন শুক্রবার সারাদিন বাসার টিনের চালের উপর ছিলাম। কারন ওটা আমার আস্তানা ছিল, সবার থেকে দূরে বসে কিছু করার, কেউ খুঁজে পেত নাহ।
ওইদিন খালি আকাশ আর, গাছ আর ধর্ম সাগরের পানি এঁকেছিলাম। এমন কি দুপুরের খাবার ও খাই নাই। আম্মু অনেক বকাবকি করলো যে আমি উচ্ছন্নে গিয়েছি।
বাসার পাশে রানীর কুটিরের একটু পরে ই একটা আর্ট স্কুল ছিল। মাঝে মাঝে ই উঁকি দিয়ে দেখতাম কিছু ছেলে পেলে ছবি আঁকে। অনেক ইচ্ছা করত গিয়ে দেখি কি আঁকে ওরা। কিন্তু সাহসে কুলাত নাহ।
আমাদের ওই সময় তায় ছবি আঁকার স্কুলে পড়ার ব্যপার টা ধনীর দুলাল বা দুলালি দের ই মানাত। কারন ওদের বাপের টাকার অভাব নাই। তাই ইচ্ছা করলে ই যা খুশি করতে পারে। আমাদের মাথায় তখন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মত পাহাড় সমান বোঝা। ডাক্তার/ ইঞ্জিনিয়ার না হলে পারলে কোথাও মুখ দেখানুর লায়েক থাকবো নাহ।
এইসব আঁকা আঁকি করে আর যাই হোক পেট চালানু সম্ভব নাহ।
তবে মাঝে মাঝে কপাল ভালো হলে দেখতাম আর্ট স্কুলের ওরা স্কুলের বাহিরে বা পার্কের জামতলায় আঁকা আঁকি করত। ওই দিন গুলো ছিল আমার ঈদের দিনের মত। বেশির ভাগ সময় আমি ওদের ক্যানভাসের দিকে তাকাই থাকতাম হা করে।
তখন ই রং তুলি কিনার শখ জাগে। কিন্তু বাসায় বলতে পারি নাই।
আমাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের কারো সব শখের কথা বলতে হয় নাহ। তবে তাই বলে কি কিনবো নাহ?
বাসা থেকে টিফিন করার জন্য প্রতিদিন ২ টাকা করে দিতো। সেই টাকা খরচ না করে জমাতাম। পাশাপাশি স্কুলের বেতম আমার জন্য ফ্রি থাকলে ও বাসা থেকে বেতন টা নিতাম ১২ টাকা।
অবশেষে ৩ মাসের স্কুলের বেতন আর আমার জমানু টাকা দিয়ে কিনে ফেললাম এক সেট রং তুলি।
আহা, নিজের সম্পত্তির সে যে কি আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নাহ।
তবে সমস্যা হচ্ছে রং তুলি দিয়ে নরমাল কাগজে কিছু আঁকলে ই লেপ্তাই যেতো। প্রতিবার হাবিজাবি আঁকার জন্য ত আর আর্ট পেপার কিনতে পারি নাহ। আর আর্ট পেপার ও সস্তা ছিল নাহ, তার উপর খুদা লাগলে টিফিনের টাকা ও বেশি সেভ করা যেতো নাহ।
কিন্তু কথায় আছে যত মুস্কিল তত আহসান।
সরকারি চাকরি করার সুবাদে আব্বু অনেক অফিস থেকে ক্যালেন্ডার পেত। ত বাসায় এতো ক্যালেন্ডার দিয়ে কি হবে। আমি তখন পুরাতন মাসের ক্যালেন্ডারের পাতা গুলো ব্যবহার করতাম আর্ট করার জন্য। ভালো ই ভারি কাগজ ছিল। যদিও আর্ট পেপারের মত সুবিধা পেতাম নাহ। তাতে কি, মন্দের ভালো।
অনেক ছবি আঁকতাম তখন। আমার রুমের দেয়াল ভর্তি ছিল আমার আঁকা কাওয়ার ঠেং, বগার ঠেঙ্গে। তবে তাতে ও ভালো লাগতো।
ম্যাট্রিক দেয়ার পর পর ঢাকা চলে যাই মামার বাসায়, ওখানে আমার নিজের বাসার মত অবাধ স্বাধীনতা ছিল নাহ, তার উপর ঢাকার জ্যামের ১৩*২= ২৬ সিগন্যাল আপ ডাউন করে আর তেল পাই নাই ছবি আঁকার।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি তে ইচ্ছা ছিল চারুকলায় পরিক্ষা দিবো, তবে আলাদা ইউনিটের আলাদা এক্সট্রা ফি দিতে হবে বলে আর পরিক্ষা দেয়া হয় নাই।
জীবনের রেসে হেরে গেলাম, সব শখ কবর দিয়ে দিলাম।
তারপর আর কোনদিন ই রং তুলি ধরা হয় নাই।
কেমিস্ট্রির জটিল সব বিক্রিয়া মুখস্ত করতে কোনদিন ই ভালো লাগে নাই। ইচ্ছা ছিল হিউমেন সাইকোলজি নিয়ে পরবো। তাই প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের মিসির আলি ছিল আমার খুব ই প্রিয়।
কিন্তু সাইকোলজি পরে আর যাই হোক সংসার চলে নাহ। তাই ওটা ও কবর হয়ে গেছে আর্ট এর মত করে।
এই মুভি তে কিছু প্রতিবন্ধী শিশু নিয়ে কাজ দেখিয়েছে। আমাদের কাছে ওরা প্রতিবন্ধী হলেও ওরা কিন্তু আমাদের থেকে স্পেশাল, ওরা "ইনেভেল নাহ, ওরা ডিফারেন্টলি এবেল"।
আমি লাকি নাকি আনলাকি জানি নাহ, তবে ঘটনা চক্রে কিছু মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে যারা ওদের নিয়ে কাজ করে, যারা ওদের কে ফেলনা মনে করে নাহ, যারা ওদের নিজেদের ই পার্ট মনে করে। এমন কি কেউ কেউ এমন বাচ্চাকে জীবনে গড়ে তোলার স্বপ্ন ও দেখে।
আসলে প্রতিটা মানুষ ই আলাদা, আলাদা আলাদা ওদের কেপাসিটি। কেউ সাপোর্ট পায়, তারপর একদিন ঝলক দেখায়, আর কেউ কেউ হারিয়ে যায় কালের অতলে। হারিয়ে যাওয়া কিছু কেউ কোনদিন খুঁজতে যায় নাহ।
এমন করে কত ডিফারেন্টলি এবেল মানুষ আমাদের থেকে হারিয়ে গেছে, ওদের থেকে পৃথিবীর কত কিছু পাওয়ার কিছু, তা সৃষ্টি কর্তা ই জানে।
যাই হোক, অনেক বক বক করে ফেলেছি, আসলে মুভি টা দেখতে দেখতে অনেক ইমোশনাল হয়ে গিয়েছি, অনেক ফ্ল্যাশ ব্যাক। হটাত দেখি চোখের কোণে ও একটু পানি।মনে হয়ে চোখে কিছু পরেছে।
যাই চোখ টা ধুয়ে আসি।

পুরাতন ব্লগ থেকে নতুন করে প্রকাশ :) 

মন্তব্যসমূহ